
চাফি
অনেকক্ষণ আগে ভাতঘুম ভাঙলেও তার জের কাটেনি এখনও আমার। নইলে শাঁখের আওয়াজে চমকে উঠি?
হুম, সন্ধ্যেও হয়ে এসছে না? আর বসে বসে ঝিমালে চলবে না। ছয়মাস পর বাড়ি এসছি বলে সারাক্ষণ ঘুমোবো নাকি? নাহ্, একটু কড়া করে চা বা কফি দরকার, নইলে এই ম্যাচম্যাচে ভাব কাটার না…
চোখ রগড়াতে-রগড়াতে ডাইনিংয়ে এলাম, চেয়ারে বসতেই দেখলাম মা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে-আসতে বলছে, “আর ঘুমোস না! রাতের ঘুম টা যাবে। এমনিও সারারাত ফোন ঘাঁটিস…” আর বলতে বলতেই চলে গেল রান্নাঘরে।
বুঝলাম, কথাগুলো ভেবে রাখাই ছিল, আমার দর্শন পাওয়া মাত্র বলবে বলে। আমি আর বিরক্ত হলাম না, বরং মজা পেলাম বেশ। বাইরে থাকলে মায়ের এই বকবকটা খুব মিস করি। এমনিও আমার জীবনে এই অহেতুক চিন্তাগুলো করার আর কেউ নেই। বাবা পরপারে পাড়ি দিয়েছে প্রায় কুড়ি বছর আগে।
মা এসে জিজ্ঞেস করল, “কোনটা করব? চা না কফি?” বললাম, “যা হোক কড়া করে করো।” মা ঘাড় নেড়ে চলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর মা আবার এসে জিজ্ঞেস করলো, “চাফি করি?”
ব্যস! হয়ে গেল। এরপরের স্ক্রীপ্টটা আমার ভালো মতো জানা আছে। প্রথমে “খেয়েই দেখ্ না”র চেষ্টা, তারপর “আমার তো দারুণ লাগে” বলে বোঝানোর চেষ্টা, আর তারপর সেই অমোঘ নস্টালজিয়াস্ত্র…. “তোর বাবা খুব খেতে ভালোবাসতো জানিস তো।”
নাহ্, বাবাকে হারানোর কষ্ট কিংবা তাকে আর একবার যেকোনো ভাবে অনুভব করার ইচ্ছাও আমাকে ওই চা-কফির অদ্ভুত মিক্সচারটাকে ভালো লাগাতে পারেনি। আমি ভেবে পাইনি যে দুটোকে মেশানোর কী দরকার!
আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একবার বুঝতে চাইলাম, তারপর আর না ভেবে বললাম, “নাহ্,।”
– “খাবি না?”
– “না।”
– “বেশ।”
মা এই বলে আবারও রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
কী হল ব্যাপারটা? মা জোর করলো না? বাবার প্রসঙ্গও আনলো না? ভালোই হল। এমনিও আমার এনার্জি নেই এখন কথা-কথান্তর করার।
এখন হাতে ফোনটা নিয়ে ঘাঁটছি, কে কী মেসেজ করেছে দেখছি। ঘোর-ঘোর ভাবটা এখনও কাটেনি। এর মাঝেই খেয়াল হল, বেশ কিছুক্ষণ ধরে নাকে একটা ধূপের গন্ধ আসছে। ভারী মিষ্টি, একদম ছোটোবেলার মতো।
ঘোরটা আরও বেড়ে গেল।
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় ধূপের গন্ধ পাওয়া মানেই জানতাম বাবা ফিরবে এরপর। বাবার অভ্যাস ছিল; কলিং বেল বাজাতো না– বরং সাইকেলের বেলটা বাজাতো অদ্ভুত ভাবে। আমিও সেই আওয়াজ শুনে দৌড়ে চলে যেতাম দরজা খুলতে, সবার আগে। ছিটকিনিতে নাগাল পেতাম না বলে একটা টুল এনে রেখে দিয়েছিলাম দরজার কাছে।
হ্যাঁ, বাবা মাঝেমধ্যেই “চাফি”র আবদার জুড়তো। আমি ভাবতাম কী এমন জিনিস, বায়না ধরতাম খাবো বলে। তখন বাবা বলতো আমি আরেকটু বড় হলে একসাথে চাফি খাবো।
এরপর কী হল মনে পড়ে না আর… ব্যস মনে আছে, অনেকদিন ধূপ জ্বলেনি আমাদের বাড়িতে। আমিও বুঝে গেলাম, বাবা আর ফিরবে না…
টেবিলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছি। বুঝতে পারছি, গলার কাছে অনেকদিন পর সেই কুড়ি বছরের চেনা দলা পাকানো কষ্টটা কবজা করতে চাইছে। এদিকে ধূপের গন্ধটাও জোরালো হচ্ছে যেন। ঘুম আসছে আবার। তবে আরাম না…অস্বস্তির।
এমন সময় একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, সাইকেলের বেলের। চিনতে ভুল করিনি, এক ছুটে চলে গেলাম দরজার দিকে…
বাবা ফিরেছে!
দরজার সামনে এসে হাত বাড়াতেই থমকে দাঁড়ালাম। ঠিক কী করতে যাচ্ছিলাম আমি? দেখলাম, আমার হাত এখন দরজার যেকোনো ছিটকিনি অবধি যেতে পারে।
উহম্, অনেক হয়েছে, আর না! এবার পেটে ক্যাফিন না গেলে পাগল হয়ে যাবো আমি!
ডাইনিংয়ে ফেরত এসে দেখি মা’ও রান্নাঘর থেকে দুটো কাপ নিয়ে আসছে। গন্ধ শুঁকে আর রং দেখে বুঝলাম, চা হয়েছে। চেয়ারে বসতে বসতে মা জিজ্ঞেস করলো, “বিস্কুট খাবি না নিমকিভাজা এনেছি খাবি?” “দুটোই দাও” বলে জানি না কী মাথায় এলো বলে বসলাম, “কফি মেশাবে একটু?” মা অবাক হল, বেশি না কিন্তু হল। বললো, “আমি তো আমারটায় মিশিয়েছি, তোর চায়ে নিবি?” উত্তরে বললাম, “হ্যাঁ, তবে আজ নিচ্ছি বলে এ জিনিস কিন্তু রোজের বানিয়ে ফেলো না।”
Khub sundor re ❤️
Amio eivabe khai majhe majhe chafee 😉😄
Majhe majhe ektu taste change korao dorkar bol? ☺️
হ্যাঁ রে, একদম 💗
কাকুও হয়তো দূর থেকে সাইকেলের বেল টা বাজালেন.. চাফি, বিস্কুট টা নিয়ে বসলেন…
দাদা তুমি তো গল্পের আত্মা অবধি পড়ে ফেলেছো দেখছি 🤍🏵️
Anurag here….. The short story was really astonishing and it really made me smile ☺️. My mom also makes chaafi very certain in winter.
Keep it up didi 🧿✌️
Thanks a lot brother 😊 Stay blessed 🌸